পুলিশের মেয়ের ডায়েরি

পুলিশের মেয়ের ডায়েরি
আমার আব্বু পুলিশে চাকুরি করেন। বেশিরভাগ লোকই এই কথা শুনে অন্যভাবে তাঁকাতো। আমি বুঝতে পারতাম তারা কি ভাবতো। আমি না হয় এক পুলিশ বাবার কথা বলি। বাবা কনস্টবল থেকে এএসআই হয়েছিলেন। এক পোস্টেই ১৭ বছর। পরীক্ষা দেন, ২/৩ নং সিরিয়ালে থাকলেও প্রমোশন হয় না। এই তো সেদিন জয়েন করা ছেলেটাও আজ দারোগা, আর মনোয়ার জমাদ্দার(এএসআই এর স্থানীয় নাম) দারোগা হতে পারল না। মনোয়ার জমাদ্দার অনেক বোকা। টাকার ধান্দা না করে সারাদিন নিজের মেয়েদের বিশেষ করে বড় মেয়ের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কোন একদিন তার শ্বশুর বাড়ির  এক আত্মীয় বলেছিল পুলিশের ছেলে-মেয়ে মানুষ হয় না। কথাটা খুব লেগেছিল। তাছাড়া কনস্টেবল বলে বড়লোক শশুর, আর স্বমন্ধি কথা বলত না আব্বুর সাথে। শালির বিয়েতেও দাওয়াত পায়নি। কোন একদিন আম্মুর এক চাচি উঠোনে ঠাট্টা করে আব্বুকে বলেছিল কনস্টবলদ। তাই চাকরি ছোট হলেও আব্বুর স্বপ্ন ছিল অনেক, নিজের মেয়েদের নিয়ে। মেয়েদেরকে তিনি পড়াবেন এটাই ছিল তার ধ্যান, জ্ঞান। পড়াশোনা নিয়ে আমরা অনেক কড়া শাসন এর মধ্যে বড় হয়েছি। অনেকের কাছে ছিল এটা আব্বুর পাগলামি। সারাজীবন শুনে এসেছি পুলিশ মানেই টাকা। কিন্তু পিরোজপুরে আব্বু আমার টিউশনির পুরো টাকা না দিতে পেরে রাজা স্যার এর হাত ধরে ছিলেন মনে আছে। সব বান্ধবীদের ভীড়ে আমার রং চটে যাওয়া স্যালোয়ার সহজেই চোখে পড়ত। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি সেবার প্রথম আমরা তিন বোন ঈদের জামা পাইনি। আমার একদম পিচ্চি বোনের বয়স ছিল তিন। বাসা বদল করে নতুন থানায় নতুন বাসায় গিয়ে আব্বুর হাতে টাকা ছিল না। 
বরাবরই পড়ুয়া ছিলাম তাই রেজাল্ট ভালো হতো। আব্বুর প্রত্যাশাও বাড়তে লাগলো। কিন্তু আমার প্রশংসা অনেক অফিসারের ভালো লাগতো না। এসএসসি পরীক্ষার ৩ মাস আগে ওসি কমপ্লেইন করলে আব্বুকে অন্য থানায় বদলি করা হয়। তার কয়দিন পর কোরবানী। নতুন থানার ওসি জানালেন কোরবানীতে ছুটিতে গেলে মেয়ের এসএসসি পরীক্ষার সময় ছুটি পাবেন না। আব্বুকে ছাড়া ঈদ করলাম। কিন্তু ওসি সাহেব আমার পরীক্ষার সময় আব্বুকে ছুটি দিলেন না। পরীক্ষায় পিরোজপুর জেলায় মানবিক থেকে দ্বিতীয়, আর নাজিরপুর থানায় মানবিকে প্রথম হলাম। নতুন থানায় নতুন কলেজে ভর্তি হলাম। ওসি আংকেল তার মেয়েকে পড়াতে বল্লেন। আব্বু বল্লেন টাকা নিতে পারব না। কিন্তু ছাত্রী পড়তে চায় না। তার বাবা তাকে গাড়ি কিনে দিবে সেই স্বপ্নে বিভোর। এই সুযোগে আন্টি সোনা যাদু বলে তার কাজে হাত লাগাতে বলে। আমি খুশি মনে করি। একদিন থানার ড্রাইভার আসলে আমি আন্টিকে বলতে শুনি উনি আমাকে বেগার খাটিয়ে নিচ্ছেন। সেদিনই উনার মেয়ে পড়বেনা বলে আমার মুখের উপর দরজা দিয়ে দেয়। আর ওমুখো হইনি। যদিও পরে আমাকে নিতে এসেছিল। 
ওই থানার টিএনও এবং তার স্ত্রী আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। তাদের বাসায় আসা যাওয়া ছিল। আব্বু তেমন বাজার করতে পারতেন না বেতনের টাকায়। এমপি আসলে টিএনও’র বাসায় রান্না হতো অনেক। আম্মুকেও ডেকে নিতেন নানু(টিএনও’র বউ)। আমরা দুপুরে একটু দেরি করে খেতাম সেদিন। এমপি’র খাওয়া হয়ে গেলে নানু আমাদের জন্য ইলিশ মাছ, গরুর মাংস, মুরগির মাংস পাঠাতেন। ভাগাভাগি করে খেতাম আমরা। এসএসসির রেজাল্ট এর জন্য ২য় গ্রেডে বৃত্তি পেতাম। আর কলেজ থেকে উপবৃত্তি। তা দিয়েই নিজের আর বোনদের ঈদের পোশাক কিনতাম। আম্মুকে শাড়ি দিত নানু(টিএনও’র বউ)। এর মধ্যে ঘটলো নতুন বিপত্তি। কোন এক ঘটনায় নানু আমাকে অনেক অপমান করলেন। আমরা তার সমকক্ষ কিনা জানতে চাইলেন। কেমন আত্মীয় হই জানতে চাইলেন। উনার বাসার পাশেই বাসা তাই আমাদের ডাকেন এটাও জানালেন। সবটাই আব্বুর সামনে। আব্বুর সেই অসহায় চাওনি আজও মনে পরে। বাসায় এসে অনেক কেঁদেছি। অনেক জেদ চাপে মনে। দিন রাত এক করে পড়াশোনা করেছি।ইন্টারমিডিয়েট এ বরিশাল বোর্ড থেকে মানবিক-এ যে পাঁচ জন A+ পেয়েছিল তাদের মধ্যে আমি একজন। ইত্তেফাক, যুগান্তরে আমার ছবি বের হয়েছিল। এবারও বাবা কাছে নেই। আমার পরীক্ষার আগেই ঢাকা সিআইডিতে বদলি। কোচিং এর জন্য ঢাকা গেলাম। কলেজের ৩ বান্ধবীর সাথে হোস্টেল এ উঠলাম। আব্বু নাস্তা হিসেবে খাওয়ার জন্য মুড়ি, গুড় কিনে দিয়েছিল। সেগুলো দেখে বান্ধবীদের বিদ্রুপ হাসি ভুলিনি। অবশেষে admission test  এর সময় আসলো। প্রথম পরীক্ষা দেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজিতে ৮ম অবস্থানে admission  নেই। কয়েকদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের B unit এর পরীক্ষায় ৯২ সিরিয়াল পাই। আমার আইন নিয়ে পড়ার ইচ্ছে থাকলেও আব্বুর অনুরোধে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করি। এর মধ্যে আব্বুর ও প্রমোশন হয় টাকা ছাড়া। 
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি এখন ফুল দারোগার মেয়ে। কিন্তু বেতনতো মাত্র ৭,০০০। ঢাকায় তিন মেয়েকে পড়াতে গিয়ে আব্বা বাসাবো কদমতলা থেকে মালিবাগ পর্যন্ত পায়ে হেঁটে আসতেন। আমাকে কিছু খাওয়ার জন্য ২০ টাকা করে দিতেন। কিন্তু বাসাবো মুগদা থেকে ইউনিভার্সিটির ‘শ্রাবণ মুগদা’ বাস প্রায়‌ই নষ্ট থাকত। তখন তিনজন মিলে রিকশায় আসতাম। তাই প্রায়ই না খেয়ে থাকতাম। আব্বু একদিন সিআইডির ক্যান্টিন থেকে চুরি করে পুড়ি খেয়ে ফেলছিল। পুলিশ থেকে চোর, তাও পেটের ক্ষুধায়। যদিও পরে টাকা দিয়ে দিয়েছিলেন। আমার বেশিরভাগ জামা ছিল পুরনো, লম্বা। জুতোর নিচে সেলাই করতে করতে ভারী হয়ে গিয়েছিল। ডিপার্টমেন্টে এক ফাটাফাটি জুটি ছিল। আপুটা এখন একটি নিউজ চ্যানেলে আছেন। উনি আর উনার বয়ফ্রেন্ড আমাকে টিজ করতো। আমাকে দেখলেই বলতো তোমার গফ আসছে। আমার পোশাক, আচরণে মফস্বলের গন্ধ ছিল। আর তাই এ আচরণ। বাসায় মেহমান আসলে আমরা একসাথে খেতাম না। শুধু মেহমানের জন্য মাছ, মাংস রান্না হতো। 
আব্বু সিদ্ধান্ত নিলেন বাসা ঢাকা রাখবেন না। তাই আমাকে হলে উঠিয়ে দিলেন। হলে খাবারের দাম কম।বাসায় গিয়ে গল্প করলে বোনদের মন খারাপ হত। তাই মাঝে মাঝে বক্সে হল থেকে ইলিশ, গরুর মাংস নিয়ে যেতাম। আব্বা ধামরাইতে খালার বাসায় আম্মু আর বোনদের রেখে আসলেন। আম্মু নিজ বোনের বাসায় কাজের লোকের মতো খাটতে লাগলো। খালু আমার বোনদের দিয়েও কাজ করানো শুরু করল। খালা, খালু, খালাতো বোনরা খাওয়ার পর আম্মু আর বোনরা খেতো। প্রায়ই মাছ থাকতো না। ওরা বেল্কনিতে গেলে খালার মেয়েরা বাজে কথা বলতো। খালাকে বলতো তুমি তোমার আত্নীয়দের  জন্য লঙ্গর খানা খুলে রাখছ। খালু আন্টির ব্যগ থেকে টাকা নিয়েছিল। কিন্তু আন্টি আমার মেজ বোনকে চোর বানিয়েছেন। তার পরেই আব্বু আলাদা বাসা ভাড়া করে। আমি ইন্টারের রেজাল্ট এর জন্য ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেতাম। ভাগ্যক্রমে রোজার সময় সেই টাকা পেতাম। তা দিয়ে সবার ঈদের শপিং করতাম। এর মধ্যে টিউশন শুরু করে আব্বার কাছ থেকে টাকা আনা বন্ধ করলাম। বোনদের চাহিদা পূরন করতাম সাধ্য মতো। আজ আমি ঢাকার নামকরা এক কলেজে শিক্ষক হিসেবে আছি। ছোট বোন মালয়েশিয়া থেকে IT তে গ্রাজুয়েশন করে মালয়েশিয়াতে জব করছে। মেজ বোন ও বিবিএ কমপ্লিট করে এখন কিছু করার চেষ্টা করছে। আমার বাবার পজিশন ছোট হলেও স্বপ্ন বড় ছিল। কতটুকু সফল হয়েছি জানিনা। তবে পুলিশের ছেলে-মেয়ে মানুষ হয় না, শিক্ষিত হয় না এটা পুরোপুরি সত্য নয়। আব্বু ২০১০ এ স্ট্রোক করে প্যারালাইজড। অনেকে বলে নিশ্চয়ই এ পা দিয়ে কাউকে লাথি দিয়েছিল তাই এ অবস্থা। পুলিশ ছাড়া কি কেউ স্ট্রোক করে না? পুলিশ নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু আমাদের মতো কিছু উদাহরণও আছে। ভালো মন্দ তো সব যায়গায় আছে তাই না? আল্লাহ আমার আব্বু আম্মুকে সুস্থ রাখুন, নেক হায়াত দিন। দোয়া করবেন। 
কৃতজ্ঞতা- Umme Hani Mukta