পুলিশের চাকরি উপভোগ করছি

বিথী, নাজমুন, নমিতা আর প্রিয়াঙ্কা-চারজনই কিশোরী। মাত্র ঊনিশে পা দিয়েছেন।’ চলতি বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে তাঁরা নিলেন দেশরক্ষার শপথ। তাঁরা বর্তমানে মিরসরাইয়ের’ জোরারগঞ্জ থানায় কর্মরত আছেন কনস্টেবল পদে। নবীন চার নারী পুলিশে’র জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন : এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসরাই


পুলিশের চাকরি উপভোগও করছি
নাজমুন নাহার ও নমিতা রানি দে চলতি’ বছরের শুরুতে পুলিশে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রথমে যোগদান করেন চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর পুলিশ’ লাইনে। চাকরি জীবনের শুরুতেই ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের দুজনকে। সীতাকুণ্ডের চৌধুরীপাড়ায় সন্ধান পাওয়া জঙ্গি আস্তানা ছায়ানীড়ের অপরারেশন ‘আ্যাাসল্ট সিক্সটিনে’ অংশ নেন তাঁরা।

নাজমুন নাহার বলেন, ‘প্রথম দিকে প্রচণ্ড ভয় হয়েছিল। পরে সাহসও যোগ হয়েছিল। তবে ওই অভিযানের কথা কখনো ভুলব না। সেদিন জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি ছিলাম আমরা।’ ওই অভিযান ‘নিয়ে নমিতা বললেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। তবে আমাদের স্যারেরা আমাদের সাহস জুগিয়েছিলেন। এখন যেকোনো অভিযানে যেতে আমরা প্রস্তুত।’

জোরারগঞ্জ থানায় কর্মরত অপর দুই নারী কনস্টেবল বিথী এবং প্রিয়াঙ্কারও আছে প্রথম অংশ নেওয়া বড় অভিযানের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

প্রিয়াঙ্কা রানি শীল জানালেন, চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার পর হালিশহর পুলিশ লাইনে যোগদান করেই সীতাকুণ্ডের একটি ‘জায়গা-জমির বিরোধ নিয়ে দুই পক্ষের মারামারির ঘটনায় অভিযানে যান তিনি। সেদিন বেশ খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অবশ্য পরে পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

চাকরি জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা নিয়ে বিথী আক্তার বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের একটি কারখানার জমি নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় সঙ্গীয় ফোর্স হিসেবে আমিও ছিলাম। ভয় করেছিল সেদিন। এখন আর এসব ভয় মনে হয় না। এ ধরনের অভিযান শিখতে সাহায্য করে, পেশাগত দক্ষতা বাড়ায়।’

কেমন লাগছে থানার কর্মক্ষেত্র?-এমন প্রশ্নের জবাবে এই চার নারী পুলিশের একই উত্তর, ‘থানার সিডিউল ডিউটিতে অংশ নিয়ে থাকি। সিনিয়র কনস্টেবল থেকে শুরু করে আমাদের স্যারেরা বেশ সাহায্য করেন। এখন পুলিশের চাকরিটা উপভোগও করি।’

পুলিশ কনস্টেবল বিথী আক্তারের বাবা মো. শহীদ কাজী চাঁদপুর সদর থানার পাশে ছোট্ট একটি দোকান করে সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন। পুলিশের চাকরির ক্ষেত্রে উৎসাহের মূলে র’য়েছেন বিথীর মা শিরিন আক্তার। স্থানীয় বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করার পর বাবার পাশে দাঁড়াতে পুলিশে আবেদন করেন তিনি। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন। চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর সদর ইউনিয়নের দাশদি গ্রামের মেয়ে বিথী আক্তার পুলিশের চাকরিতে থেকেই এম এ পাস করে একদিন বড় পুলিশ কর্মকর্তা হতে চান।

বর্তমানে পুলিশ বিভাগে বিশেষ করে থানা পর্যায়ে কাজের পরিবেশ নারীদের জন্য কতটুকু সহায়ক জানতে চাইলে বিথী বলেন, ‘এখানে কোনো সমস্যা নেই। পুরুষ সদস্যরা যেভাবে কাজ করছেন আমরাও কাজ করছি। সিনিয়ররা বিশেষ করে আমাদের স্যারেরা আমাদের কাজে ‘পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন।’

পুলিশ কনস্টেবল নাজমুন নাহারের বাবা সৌদি আরব প্রবাসী মো. আলাউদ্দিন।  নোয়াখালী জেলার সিরাজপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের সিরাজপুর গ্রামের মেয়ে নাজমুন এসএসসি পাস করেন স্থানীয় সিরাজপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। গত শিক্ষাবর্ষে সরকারি মুজিব কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন। মামার উৎসাহে পুলিশে যোগদান করেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করে তিনিও একদিন বড় পুলিশ কর্মকর্তা হতে চান।

থানায় কাজের পরিবেশ নিয়ে নাজমুন নাহার বলেন, ‘আমি পুলিশের চাকরিতে একবারে নতুন। থানায় যোগদান করার পর থেকে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। স্যারদের পরামর্শ ও নির্দেশনা নিয়ে নিজের সবরকম দায়িত্ব পালন করি।’

আরেক পুলিশ কনস্টেবল নমিতা রানি দের বাবা সুনীল চন্দ্র দে একজন কৃষক। নোয়াখালী জেলার কবীরহাট উপজেলার চাপলাশি ইউনিয়নের অমরপুর গ্রামের মেয়ে নমিতা স্থানীয় কবীরহাট সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন। পুলিশের চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেন তিনি। তাঁর ইচ্ছা পড়াশোনা শেষ করে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা হওয়া।

নমিতা বলেন, ‘পুলিশের চাকরি আমার জীবনে একটি চ্যালেঞ্জ। আমি চ্যালেঞ্জ জয় করতেই এই পেশায় এসেছি। চাকরির ক্ষেত্রে পরিবেশ বেশ ভালো। খারাপ লাগছে না।’

পুলিশ কনস্টেবল প্রিয়াঙ্কা রানি শীলের বাবা কৃষ্ণ লাল শীল একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার সদর ইউনিয়নের চর বজলুর করিম গ্রামের মেয়ে প্রিয়াঙ্কা এসএসসি পাস করেন চর আমান উল্ল্যা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। পুলিশের চাকরির পাশাপাশি তিনি নোয়াখালীর সৈকত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বিএ (পাস)) প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। পুলিশে চাকরির ক্ষেত্রে উৎসাহ দেন বড়ভাই পরেশ চন্দ্র ‘শীল। পড়াশোনা শেষে প্রিয়াঙ্কাও একদিন বড় পুলিশ কর্মকর্তা হতে চান।

প্রিয়াঙ্কা রানি শীল বলেন, ‘চাকরিতে যোগদানের আগে বেশ ভয় করত-এমন চ্যালেঞ্জিং কাজ পারব কি না। তবে ট্রেনিং নিয়ে এখানে যোগদানের পর থেকে ভালোই লাগছে। তবে পুলিশের চাকরিতে ছুটি কম। তাই মাঝে মাঝে পরিবারের লোকজনের জন্য মন খারাপ হয়।’

জানতে চাইলে জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল কবির আমাদেরকে বলেন, ‘তাঁরা খুবই উদ্যমী। কাজের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল। আমরা তাঁদেরকে নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখি। আমার বিশ্বাস তাঁরা সুদক্ষ পুলিশ হিসেবে দেশের পুলিশ বিভাগকে আরো সম্মানিত করবে।

পুলিশের চাকরি উপভোগও করছি