করোনা টিকার নিবন্ধন: খোদ বিশেষজ্ঞরাই ভোগান্তিতে

 

করোনার টিকা নিতে নিবন্ধন করতে হচ্ছে সুরক্ষা ওয়েবসাইটে। তাতে দেখা দিচ্ছে জটিলতা। অনেকেই বুঝতে পারছেন না ওটিপি (ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড) কিভাবে কোথায় বসাবেন। বিশেষ করে প্রযুক্তিতে যারা পিছিয়ে তাদের অনেকেই নিবন্ধন জটিলতায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন টিকা থেকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাম নিবন্ধনের প্রক্রিয়া জটিল হয়ে গেছে। এর যথাযথ প্রচারও নেই। এমনিতেই মানুষ করোনা টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করছে। নিবন্ধন করতে গিয়ে জটিলতায় পড়লে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল নিজেও অ্যাপে নিবন্ধন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছিলেন। সাহায্য নিতে হয়েছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন করতেই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হলো। কিন্তু টিকা কবে নিতে পারবো, তা এখনও জানতে পারলাম না। নিবন্ধন করার চেষ্টা করেও পারছিলাম না। পাঁচ দিনের চেষ্টায় গত শুক্রবার পেরেছি। তবে আমি নিজে শেষ পর্যন্ত করতে পারিনি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা করে দিয়েছেন।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য হয়েও যদি জটিলতায় পড়তে হয়, তবে সাধারণ মানুষের জন্য তা কতটা কঠিন হবে, এমন প্রশ্নে আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘এটা আসলেই খুব কঠিন। আমিতো জানতামই না ওটিপি কী জিনিস। যখন নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দেই তখন বলা হলো একটি ওটিপি নম্বর যাবে মোবাইলে। ফোন দিলাম স্বাস্থ্য অধিদফতরে। কর্মকর্তা জানালেন এটা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড। সেটা দিলাম। পরে আরও একবার দিতে হলো। এই যে ওটিপি দুবার আসতে পারে, এটা বুঝতে পারাও কি সহজ?’

৭ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে একযোগে করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়া শুরু হবে। এজন্য প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিবন্ধন কম কেন জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘প্রাথমিক অবস্থায় গোছগাছ করে প্রক্রিয়াটাকে বাগে আনতে একটু সময় লাগে। একসঙ্গে অনেক কাজ হচ্ছে। নিবন্ধন, টিকা পৌঁছে দেওয়া, প্রশিক্ষণ, সবই চলছে। ধীরে ধীরে সবকিছুই গতি পাবে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি হয়েছে। কিছু প্রচার শুরু হয়েছে।

তবে এ কাজ কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার নয় মন্তব্য করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এ কাজে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করতে হয়। প্রচারও লাগবে। অর্থ ছাড়ের কাজও চলছে। এটা বড় এক কর্মযজ্ঞ। অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে একটু সময় লাগবে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম আলম বলেন, রাজধানী ঢাকার ৬৫টি কেন্দ্রে ২০৬টি দল টিকা দেওয়ার কাজ করবে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মিলিয়ে ৯৫৯টি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে দুই হাজার ১৯৬টি দল টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এদের মধ্যে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন ভ্যাকসিনেটর হিসেবে। তারা ভ্যাকসিন দেবেন। বাকি দুজন স্বেচ্ছাসেবক।

নিবন্ধন প্রক্রিয়া ঢেলে সাজানো, প্রচার বাড়ানো এবং টিকাদান কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা- এ তিন বিষয়ে দ্রুত সমাধানে না পৌঁছালে করোনা টিকা কার্যক্রম খুব একটা সুফল বয়ে আনবে না বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ফলাও করে প্রচার করা হলো অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন হবে। অথচ নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরও বাস্তবসম্মত উপায় বেছে নেওয়া দরকার ছিল। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সহকারী, সিএসসিপি, পরিবার কল্যাণ সহকারী, এনজিওকর্মীরা রয়েছেন। তাদেরকে নিবন্ধন কাজে যুক্ত করা যেত। কিন্তু তা না করে স্বাস্থ্য অধিদফতর তড়িঘড়ি কেন অ্যাপের দিকে ঝুঁকলো সেটাই বড় প্রশ্ন।’

তিনি আরও জানান, ‘স্বাস্থ্যকর্মীদের যুক্ত করতে হবে প্রচারের কাজে। তারা উঠোন-বৈঠক করবেন, যোগাযোগ করবেন। টিকা নিয়ে মানুষের সংশয়-সমস্যা কাটাতে কাজ করবেন।’